About

অনুরাগ - হাবিবা সরকার হিলা


আমি আমার বরকে নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম। ৫ ফুট সাড়ে আট ইঞ্চির উচ্চতার দীর্ঘকায় পুরুষ। চওড়া কাঁধ, লোমশ বুকে আদিম উত্তাপ। চিবুকের ভাজে সামান্য টোল, চেহারায় দুষ্টুমি খেলা করে।এসব কিছু সাধারণ, ভালোবাসি তাই আমার চোখে অসাধারণ হয়ে চোখে পড়ে।

ভীষণ অগোছালো। প্রথম যেদিন দেখা হল, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। কানের ভাজ অপরিষ্কার, বা'হাতের কড়ে আঙুলে ময়লা, ফর্মাল শার্টে ঘামে ভিজে চপচপ করছে। এমন মানুষ অহরহ কত দেখি অথচ এমানুষটা কত আপনার। বলতে দ্বিধা নেই, সে কথাবার্তায় ভীষণ স্মার্ট। কথা বলবে আর ঠোঁটে লেগে থাকবে ভালোমানুষি হাসি। এ হাসিটা আমাকে পাগল করার জন্যে যথেষ্ট ছিল।

বিয়ের পর দুজনে ঘুরে বেড়াতাম মাইলের পর মাইল। দু'পাশে গাছের সারি,মফস্বলের শান্ত রাস্তা।লোকটাকে পাঞ্জাবিতে বেশ মানায়।হ্যাংলার মত একটু পর পর দেখছিলাম।

-দেখো তো তোমার পাশে বসলে আমাকে কতটুকু লাগে?

-হা হা হা!

-হাসছ যে! আমি কি খুব খাটো?

-ইশা,আমি তোমাকে কখনও খাটো বলি নি। অ্যাভারেজ পারফেক্ট হাইট। ৫ ফুট ৫ এত লম্বা মেয়েকে কোলে নিলে কেমন লাগবে,বলো?

খুশি হয়ে তার কাঁধে মুখ লুকাতাম। লোকটার কমপ্লিমেন্ট দেবার কৌশলও ভয়াবহ।আপনাকে খুশি করিয়ে ছাড়বে।

মাখামাখি প্রেম শেষে আমি তার গলা জড়িয়ে ধরতাম ।
-আবির,
-বলো।
-ভালোবাসো?
-এ কেমন প্রশ্ন।
-আহ! আনসার দাও।
-বলব না।

তাকে আঁচড়ে কামড়ে অস্খির করে তুলতাম।সে শক্ত দু'হাতে আকড়ে ধরে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখত। হাতপা ছোঁড়াছুড়ি বন্ধ হলে টুপ করে কপালে চুমু খেয়ে বলত,

-ইউ অার অ্যা স্যাডিস্ট।

-ইয়াপ।বাট ইউ প্লিজ, অানসার দ্যা কোয়েশ্চেন।

-ফ্রেশ হও,বেইবি।

সে পাশ ফিরে ঘুমানোর ভান ধরত।

বিন্দু বিন্দু জলে সমস্ত রাগ,ক্ষোভ,ক্লান্তিবোধ ধুয়ে মুছে যেত।শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতাম।পিঠ ছাপিয়ে চুলের বোঝা, দীঘল ভ্রূ অথবা কোমরের বক্র অাঙ্গিনা তাকে ইমপ্রেস করতে পারে নি। বউ হিসেবে কি খুব খারাপ? শেষ কবে ঝগড়া করেছিলাম মনে করতে পারছি না। ঘ্যানঘ্যান করলে আবির কথা বলে অফ করে দিত এ আমার কাছে মৃত্যু যন্ত্রণার মত লাগত। অতঃপর চুপ থাকতাম।
অফিসের কলিগ, অনলাইনের জগতের শত সহস্র নারী। তাকে প্রশ্ন করতাম,

-তুমি কি কারো প্রতি আসক্ত?

-আমি দেখতে এমন হ্যান্ডসাম না যে মেয়েরা ঝাপিয়ে পড়বে।

খুশি হয়ে নাকে নাক ঘষতাম।

-আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।

-করো না।আমি কতটা খারাপ তা আমি নিজেই জানি।

আবির বলত,

-তোমার প্রথম প্রেমিকের গল্প বলো।

একটা ছেলে নীল ট্রাউজার আর নীল টিশার্ট পরা। ঠিক সূর্য দেবার আগ মুহূর্তে বালুচরে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
-আরেকটু থাকো।কনে দেখা আলোয় তোমার মুখটা দেখি

-এতো আমার গল্প। ফার্স্ট টাইমের কথা বলো।

-মনে করতে পারছি না।

-বাদ দাও।তোমরা মেয়েরা এখনও অনেকটা কনজারভেটিভ। সত্যটা স্বীকার করতে ভয় পাও।

নীরব থাকতাম। যে মানুষ এতকাছে এসে, এতবার স্পর্শ করে একবারও বুঝে নি সে আমার প্রথম পুরুষ তাকে আমি কি গল্প শোনাব।

ডির্ভোস! আবিরকে ছেড়ে যেতে চাই নি। বার বার হাতজোড় করে বলেছিলাম,
-প্লিজ, তোমার পায়ে একটু স্থান দাও।
-নো ওয়ে। ইশা, ন্যাকামো করো না।
-আমার দোষ কি?
-তুমি আমার টাইপ নও।
-আমি ঠিক তোমার মনের মত করে নিজেকে গড়িয়ে নিব।
-পারবে না।
-প্লিজ...
সে নিরুত্তর.....

একের এক ফোনকল। রিলেটিভ,পরিচিতরা জানতে চায় ডির্ভোসের কারণ। উত্তর জানা নেই। ফোন অফ, দরজা -জানালা বন্ধ করে বৃত্তের বাইরে বাস করা শুরু করলাম। অফিস আর টুকিটাকি কাজের বাইরের সময়টা তাকে ভাবি। নিজেকে মনে হয় হীন, নীচ শ্রেণীর প্রাণী। কারো ভিতর, বাহির পুরোটা দখল করেও তার মনের ভিতর জায়গা পেলাম না।কি বোকা আমি! তার শরীরী চাহিদাকে প্রেম ভেবেছিলাম। কপালের মাঝখানে ছোট্ট চুমু, হাতে হাত রেখে অজানায় ছুটে চলা এ ছিল আমার কাছে ভালোবাসা তারকাছে মোহ। যা ছিল আমার কাছে সংসার তারকাছে খেলাঘর।

পারিবারিক মতে সিদ্ধান্ত নিলাম, বিয়ে করব।আমার মত ডির্ভোসি কেউ। তা হোক,কষ্টটা বুঝবে। ভদ্রলোকের কাছে কথা বলে বুঝলাম,
প্রথম সংসারে স্বপ্ন থাকে, দ্বিতীয়তে সমঝোতা।

করব না, করব না করেও আবিরকে ফোন করলাম। ভালো নেই আমি।জানালাম,
-ভালো আছি।তার দেয়া দগদগে ঘা শুকিয়ে গেছে। বিয়ে করছি।

ওপাশ থেকে ৩০ সেকেন্ড স্খির চুপ করে থেকে বলল,
-কনগ্রেচুলেশনস।আশা করি এমানুষটা তোমাকে সত্যি ভালোবাসবে।
-ভালোবাসা! আপন মনে হাসলাম

প্রিয়তম, দীঘির জলের তৃষ্ণা কি নোনাজলে মিটে!

আবির দেখা করতে চাইল।জনমের মত বিদায় তো আনুষ্ঠানিকভাবে দিয়ে দিয়েছে।নিতান্ত ভদ্রতাবোধে এককাপ কফির অফার সাথে নতুন জীবনের জন্যে শুভকামনা।

দেখা হল।এই তো সে।আমার আবির। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। ঠোঁটে চিরচেনা হাসি। ডানহাতের কালো ঘড়িটা পর্যন্ত এখনও বদলায় নি।পাশে এসে বসলাম।সে দেখছিল, আমাকে নাকি আমার বদলে যাওয়াকে।

-ইশা,কাল তুমি ফোন করবার পর বস এসে জিজ্ঞেস করে আপনার চোখে পানি কেন?

-তারপর,

-বললাম, প্রচণ্ড মাথাব্যথা।

-ও।

-আমি জানি আমি তোমাকে ভালোবাসি না, ডির্ভোসের সিদ্ধান্তও আমিই নিয়েছিলাম।তবু এত খারাপ লাগছে কেন?

-বিয়েটা করছি না আমি।

-ইশা,প্লিজ। তুমি তো জানো এই আমি কিছুক্ষণ পর ভীষণ কঠোর হব।কিন্তু এমুহূর্তে মনে হচ্ছে তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি।

-জানি। কঠোর হবা।

-তো?

তার চোখের কণায় চিকচিক করছে ভালোবাসা মাখা এক ফোঁটা নোনাজল।

-ঠিক এমুহূর্তে তোমায় পেয়েছি,আর কোনো অতৃপ্তি নেই আমার।

Post a Comment

0 Comments